মাজার জিয়ারত কি জায়েজ? পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে আউলিয়া কেরামের মাজার জিয়ারতের ১১টি অকাট্য দলিল
ভূমিকা
ইসলামিক আধ্যাত্মিকতা ও আক্বিদার জগতে আউলিয়া কেরাম বা আল্লাহর বন্ধুদের মাকাম অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। যুগে যুগে এই মহান ব্যক্তিরাই ইসলামের আলো সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে কিছু মানুষ মাজার জিয়ারতকে শিরক বা বিদআত বলে ফতোয়া দিয়ে সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। অথচ পবিত্র কুরআন, সহীহ হাদিস এবং যুগশ্রেষ্ঠ ইমামগণের আমল দ্বারা প্রমাণিত যে, আল্লাহর ওলীদের মাজার জিয়ারত করা কেবল জায়েজই নয়, বরং এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং বরকত লাভের মাধ্যম। আজ আমরা এই বিষয়ে বিস্তারিত দালীলিক আলোচনা করব।
১. আল্লাহর ওলীদের পরিচয় ও মর্যাদা: পবিত্র কুরআনের আলোকপাত
আল্লাহর ওলী কারা এবং তাদের মর্যাদা কতটুকু, তা আল্লাহ পাক নিজেই কুরআনে ঘোষণা করেছেন।
- সূরা ইউনুস (আয়াত ৬২): আল্লাহ বলেন, "জেনে রেখ! আল্লাহর বন্ধুদের কোনো ভয় নেই আর তারা দুঃখিতও হবে না।" এই আয়াত প্রমাণ করে যে, আল্লাহর ওলীরা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাহানেই আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তায় থাকেন।
- সূরা কাহাফ (আয়াত ১৭): এখানে আল্লাহ পাক 'অলি-মুর্শিদ' বা পথপ্রদর্শনকারী অভিভাবকের কথা উল্লেখ করেছেন। হেদায়েত প্রাপ্তির জন্য আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সান্নিধ্য যে জরুরি, তা এই আয়াত থেকে স্পষ্ট।
- সূরা আল-ইমরান (আয়াত ১৬৯): আল্লাহ এরশাদ করেন, "যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে মৃত মনে করো না; বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত।" আউলিয়া কেরাম যারা নফসের সাথে জিহাদ করে নিজেদের আল্লাহর পথে বিলীন করেছেন, তারাও এই বিশেষ 'বারযাখি' জীবনের অধিকারী।
২. মাজার জিয়ারত কি জায়েজ? হাদিসের অকাট্য প্রমাণ
মাজার জিয়ারতের বৈধতা স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (ﷺ) দিয়েছেন।
- দলিল ১ (সহীহ মুসলিম): নবীজি (ﷺ) ইরশাদ করেন, "ইতিপূর্বে আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন থেকে জিয়ারত করো।" ইসলামের শুরুর দিকে নতুন মুসলমানদের ঈমানী নিরাপত্তার জন্য কবর জিয়ারত বন্ধ থাকলেও, পরে নবীজি (ﷺ) নিজেই এর অনুমতি দেন।
- দলিল ২ (ইবনে মাজাহ): হযরত ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (ﷺ) বলেন, "আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন থেকে করো। কারণ এটি দুনিয়াবিমুখতা তৈরি করে এবং আখেরাত স্মরণ করিয়ে দেয়।"
- দলিল ৩ (মেশকাত): নবীজি (ﷺ) বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রতি শুক্রবার তার বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করবে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সাধারণ মানুষের কবরে যদি এত ফয়েজ থাকে, তবে আল্লাহর ওলীদের মাজারের মর্যাদা কত বেশি হতে পারে!
৩. সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহীনদের আমল
সাহাবায়ে কেরাম ও বড় বড় ইমামগণ বিপদে পড়লে নবীজির রওজা মোবারক বা ওলীদের মাজারের উসিলা নিতেন।
- হযরত ওমর (রা.)-এর আমল: হযরত ওমরের আমলে একবার প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে জনৈক সাহাবী (হযরত বেলাল বিন হারেস) নবীজির রওজা মোবারকে এসে বৃষ্টির জন্য আবেদন করেন। পরে স্বপ্নযোগে তাকে সুসংবাদ দেওয়া হয় এবং বৃষ্টি বর্ষিত হয়। (সূত্র: আল মুসান্নাফ, ফতহুল বারী)।
- ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর আক্বিদা: ইমাম শাফেয়ী বলতেন, "আমি যখনই কোনো সমস্যায় পড়ি, ইমাম আবু হানিফার মাজার জিয়ারত করি এবং তাঁর উসিলায় দোয়া করি। তৎক্ষণাৎ আমার হাজত পূরণ হয়ে যায়।" (সূত্র: রাদ্দুল মোহতার)।
- ইমাম ইবনে হাজর মক্কী ও শায়খ আব্দুল হক দেহলভী: তারা স্পষ্ট লিখেছেন যে, আউলিয়া কেরামের মাজার জিয়ারত করা এবং তাদের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করা উলামায়ে কেরামের চিরন্তন রীতি।
৪. মাজার জিয়ারতের আধ্যাত্মিক উপকারিতা ও আউলিয়াদের কারামত
আল্লাহর ওলীরা কবরে জীবিত থাকেন এবং জিয়ারতকারীদের সাহায্য করতে পারেন।
- রূহানি যোগাযোগ: শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী (রহ.) লিখেছেন, আউলিয়া কেরামের রূহ মোবারক বেসাল বা ইন্তেকালের পর আরও বেশি শক্তিশালী হয়। যখন কেউ তাদের মাজারে গিয়ে মনোযোগ দেয়, তখন জিয়ারতকারীর রূহের সাথে ওলীর রূহের যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং রূহানি ফয়েজ হাসিল হয়।
- শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.)-এর ঘটনা: শাহ ওয়ালিউল্লাহর জন্মের আগে তাঁর বাবা শাহ আব্দুর রহীম কুতুবউদ্দীন বখতিয়ার কাকী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। সেখানে শায়খ বখতিয়ার কাকীর রূহ মোবারক দৃশ্যমান হয়ে তাকে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দেন। (সূত্র: আনফাসুল আরেফীন)।
৫. মাজার জিয়ারতে কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও তার জবাব
অনেকে মনে করেন মাজারে যাওয়া মানেই ইবাদত করা। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। ইমাম সাবী মালেকী (রহ.) বলেন, যারা মুসলমানদের মাজার জিয়ারত করার কারণে কাফের বলে, তারা নিজেরাই গোমরাহ। মুসলমানরা মাজারের ইবাদত করে না, বরং আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে সেখানে যায়।
৬. জিয়ারতকারীর জন্য জরুরি কিছু আদব
মাজার জিয়ারতের সময় আমাদের কিছু আদব রক্ষা করা উচিত:
১. মাজারকে সেজদা করা যাবে না (সেজদা একমাত্র আল্লাহর জন্য)।
২. মাজারের চারপাশ তাওয়াফ করা যাবে না।
৩. আদবের সাথে দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করতে হবে।
৪. আউলিয়া কেরামের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে।
৫. সেখানে কোনো অনৈসলামিক কাজ করা যাবে না।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, আউলিয়া কেরামের মাজার জিয়ারত করা একটি বরকতময় আমল। এটি ঈমানকে সতেজ করে এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ করে দেয়। যারা একে শিরক বা হারাম বলে ফতোয়া দেয়, তারা মূলত পবিত্র কুরআন ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা থেকে বিচ্যুত। আমরা যেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সঠিক আক্বিদায় অটল থাকতে পারি এবং আউলিয়া কেরামের নেক নজর ও ফয়েজ লাভ করতে পারি। আমীন।

Post a Comment